পদ্যাঙ্কুর ২

১.

আমার চেতনে রয় না চারিপাশ
মাথার ভেতর উছলে পড়ে
আত্মপ্রেমের অন্ধকার, প্রগাঢ় অন্ধকার…
ওরা বলে আর আমি শুনি
বারবার শুনি, প্রতিধ্বনি তোলে ওদের কথা
‘তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে ভালোবাসি নার্সিসাস…’

২.
প্রজাপতি,
তোমার পাখার লাল আগুনে ঝাপ দিতে
উদ্বাহু আমি।
কি শোকের মাতম দেখেছো
আমার তরে…
তুমি কি নার্সিসাস হবে প্রজাপতি?
আমারই তরে?…

৩.

খুঁজলে আমার হাজার দোষ পাবে…
না খুঁজলে আমাকেই পাবে না…

৪.

অদ্ভুত আলো তোমাদের চোখে
খুব অদ্ভুত সেই আলো
আজরাইলের খাতায়
অনুপস্থিত থাকার দিন বুঝি শেষ
৪৫ এ জাপানে পড়া বোমাগুলো
তোমাদের চোখের আলোর মত
এতটা তেজস্ক্রিয় ছিল না

৫.

তোমাকে খুঁজতে যাব না কোনদিন…
অন্ধকারে অন্ধকার খুঁজে কি লাভ?
বরং আমি চোখ বুজে থাকি…
আমার অক্ষম বোধে স্খলিত হবে পাপ…
তোমার যত পাপ আমার তরে

৬.

কিন্তু
প্রত্যেকটা দিন
প্রতিটা মুহূর্তে
তোমার যদি মনে হয়– নিয়তি তার হৃদয়হীন মাধুর্যে
তোমাকে শুধু আমার একান্ত করে দিয়েছে;
যদি কোন ফুল প্রতিদিন
তোমার অধর ছুঁয়ে আমায় পেতে চায়,
তবে জেনে রেখো প্রিয়তমা
এইসব আগুন আমার ভেতর প্রজ্জলিত হয় বারবার
নেভে না সেই আগুন, না হয় বিস্মৃত…
প্রিয়তমা তোমায় আঁকড়ে ধরে থাকে সেই প্রেম;
নিয়তি তোমার আমার প্রেমের নিরুপায় ঠিকানা হয়ে বাঁচবার
ক্ষণমাত্র বিস্মৃত না হয়ে এই আমাকে।

মূলভাবঃ পাবলো নেরুদা (A song of despair)

নির্ঘুম কবিতা

একটা শহর চাই,
যেখানে সকল রাত নির্ঘুম,
যেখানে ঘুমায় না সাইকেলের চাকা,
যেখানে সূর্য ওঠে না আলসেমিতে,
যেখানে চুলার ওপর বিশাল বিশাল তাওয়াগুলো জানে না
সাইবেরিয়া কি খায় না মাথায় দেয়!
আসেন ভাই বেরাদর একটা ছোট্ট গেম খেলি-
ভাবি এটাই সেই শহর যেখানে আমি আছি;
নির্ঘুম সাইকেলের চাকায় ভর দিয়ে উড়ে চলি
সাইবেরিয়া সংক্রান্ত ভূগোল না জানা তাওয়ার ‘পর
আত্মাহুতি দেয়া একঝাক রুটির উদ্দেশ্যে;
আর জানাজা পড়ি মৃত সূর্যের, করি হুলুস্থুল স্মরণসভা।

ট্র্যাজেডিঃ সিনিকের পিনিক

আমি মহাপুরুষ নই
ক্লেদাক্ত কাপুরুষ আমি
তবুও যখন শুধাই – কেমন আছো তুমি,
কি করছো আজকাল
সাধারন্যের জন্য গতবাঁধা যে উত্তর তোমার
তাতে খুজি কোন “ইনার মিনিং”
সুখের ভেতর দুঃখ খুজি
হাসিতে বিষাদ আর অশ্রুতে আনন্দ
অতন্দ্রিলা তুমি আমাকে হয়ত বলবে “সিনিক”
আমি বলি কি ইহাই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ “পিনিক”।

অপেক্ষায় সূর্য দেবতার মন্দির

আমার ছায়া ঢাকা দিনগুলো হয়েছে অতীত
প্রখর সূর্যকিরণে উজ্জ্বল ট্রয়ের সৈকতে
আমি দাড়ায়েছি একা- একিলিসের মত,
অপেক্ষায় সূর্য দেবতার মন্দির, ধ্বংস হবার জন্য
আমার অস্ত্রাঘাতে গুড়িয়ে যাবার জন্য,
পেছনের সাগরে হাজার খানেক জাহাজে হাজার হাজার যোদ্ধা
ওরা আমার কেউ নয়। ট্রয়ের সৈকতে আমি একা একিলিসের মত,
অপেক্ষায় সূর্য দেবতার মন্দির আমার আশির্বাদে ধ্বংস হবার জন্য।

বিদ্রোহী মৃত পিঁপড়েরা

আমি পিঁপড়ে খাই- না না খেতাম,

অর্থাৎ আমি এক পিঁপড়েভূক ছিলাম;

লাল-কালো সব পিঁপড়েই আমি খেয়েছি,

নিশ্চিন্তে অনেক পিঁপড়েই আমি খেয়ে নিয়েছি।

বিশ্বাস কর, সত্যিই আমি পিঁপড়ে খেয়েছি,

অনেক খেয়েছি- অনেক অনেক খেয়েছি,

আর তারপর উদ্‌গার তুলে কাঁপিয়ে দিয়েছি ধরণীরে।

সব পিঁপড়েই আমি খেয়েছি, বড় বড় কালো-

আম গাছের পিঁপড়ে, কিংবা মাটির ঢিবির লাল পিঁপড়ে,

অথবা ডাইনিং টেবিলের গা বেয়ে চলা-

কালো পিঁপড়ের সারি, সাবাড় করেছি পরম নৈপুণ্যে।

 

পিঁপড়েরা বিদ্রোহ করেছিল- এমনটি বলব না,

বাঁচার প্রবণতায় সহজাত প্রত্যাক্রমন- সেতো স্বাভাবিক,

কিন্তু মারা যাবার পর- গাঁজাখুরি শোনাচ্ছে! না?

কিন্তু আমার খেয়ে ফেলা মৃত পিঁপড়েরা,

আমার ধরণী কাঁপানো উদ্‌গারের উৎস-

সামান্য লাল-কালো পিঁপড়েরা বিদ্রোহ করেছে,

এবং করছে যখন তারা মৃত,

অস্তিত্বহীন- সম্পূর্ণরূপে আমাতে বিলীন।

 

আমার পেট, বুক জুড়ে শত শত ব্যাটেলিয়ন,

দিনভর কুঁচকাওয়াজে মগ্ন পিঁপড়েবাহিনী।

আমার ঠেসে বমি আসে, তাতে লক্ষ লক্ষ পিঁপড়ে ভাসে,

আমার মাথায়, চুলে মৃত পিঁপড়ের ঝাঁক

ক্রলিং করে এগিয়ে চলে, আমার কান্না জুড়ে

পিঁপড়ের ডিম ভাসে, লাল-কালো পিঁপড়ের ডিম;

আমার মাথার অনেক ভেতরে পিঁপড়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে,

তারা সহস্রগুণে বেঁচে উঠছে-নির্বিচারে বেঘোরে মারা গিয়ে।

আসুক তবে, আসতে দাও

নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছের মত-
আমার কিছু নির্বাচিত আবেগ
শুধু তোমার জন্য অতন্দ্রিলা,
অন্তত আজ থেকে।

যেমন সব কবিতা সঙ্কলিত হয় না,
তেমনি সব আবেগ তোমার জন্য নয়,
তুমি কিছু নির্বাচিত আবেগের ঘেরাটোপে
বন্দি হয়ে আমার জীবনে থাকবে;
আমার কিছু কান্না, কিছু শোক,
কিছু গ্লানি তোমায় তোমায় দেখাবো না;

আসুক তবে আসতে দাও
সব মিথ্যার লেলিহান জিভ
আমায় গ্রাস করুক,
তুমি শুধু সত্যি থেকো।

আমরা বমি করা ভুলে যাচ্ছি

আমরা বমি করি, সবাই-ই করি

কেউ বা বেশী করি, কেউবা কম,

মাঝে মাঝে ভাসিয়ে দিই,

কারও বমি রক্ত মেশা-সোজা কথায় রক্তবমি;   

কারও আবার বিশ্রী দূর্গন্ধে ভরা বমি।

এতসব বমিবাজদের মাঝে,কারও কারও

বমি করা দেখতে, ঐ বমির গন্ধ শুঁকতে বেশ লাগে

যেমন ভালো লাগা থাকে প্রেয়সীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে

তাদের বমিতে কোন রক্ত থাকে না ,থাকেনা কোন পুঁজ,

তবে গন্ধ থাকে,বৃষ্টির ফোঁটার সাথে মাটির ভালবাসার বুনো গন্ধ।

বমি করার শব্দে থাকে সুর

এতে ঝিম ধরে না, তবে আরাম হয়।

 

আমারও এমন বমি বমনের ইচ্ছা জাগে,

ইচেছ করে এমন বমি সাগরে ডুবে যাই আবার ভেসে উঠি

তারপর মাথার্ভতি বমি মাখানো চুলে

দুর্গন্ধ বমি বাজদের সামনে গিয়ে

ওয়ের্স্টান কোনো মেটালব্যান্ডের ভোকালের মত মাথা ঝাঁকাই

হাতভরা বমি নিয়ে ওদের গায়ে মাখাই-শুদ্ধ বমি।

কিনপারি না বা হয়ে উঠে না

শুদ্ধ বমিবাজদের অপ্রার্চুয আর রক্তবমিবাজদের উদাসীনতায়

র্দূগন্ধবমিবাজদের কাবু করতে পারি না

হোলি ওরা আমাদের নিয়ে খেলে

আমাদের গায়ে মাথায় ওদের পুঁজরক্তভরা র্দূগন্ধযুক্ত বমি,

সেই অশুদ্ধ বমিতে আমাদের চোবায়, ভেজায়

অসহ্যকে সহ্য করতে করতে আমরা এখন বমি করাই ভুলে যাচ্ছি।

পদ্যাঙ্কুঁর

 

১.

অপার বিস্মৃতির সুখ আমায় আমূল কাপায়

ক্ষণকালের জন্য বিস্মৃত হই নিরানন্দ নিরালা

অসীম সুখের ঢেউ আছড়ে পড়ে ভৌতিক পাশবিকতায়

বিস্মৃত হই অতীত, ঝাপসা হয়ে আসে ভবিষ্যত

আমি পড়ে রই আমার চেনা জগতের অচেনা আড়ালে।

২.

এবার ঘুমোও অতন্দ্রিলা, ঘুমোও তুমি

নিস্তব্ধ শহরের বুকে কি লাভ চুপচাপ শুয়ে থেকে একা?

তোমার নিদ্রাহীন চোখ কিসের অপেক্ষায় চাতক হয়ে রয়?

অতন্দ্রিলা ঘুমোও তুমি, ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত দিনের পর যে রাত

তুমি ভেবেছিলে- কাটবে সময় জোছনা ছুয়ে ছুয়ে, কিন্তু

হায় এ শহরে জোছনা বড় অচেনা হয়ে রয়

বন্দি হয়ে কৃত্রিম রঙের হোলি খেলার বেড়াজালে;

তাই অতন্দ্রিলা ঘুমোও তুমি, ঘুমোও।

৩.

এক বিকেলে এক বিশাল সবুজ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াই

এক রাত্রিতে এক আকাশের তারায় তারায় চোখ বুলোই

এক দুপুরের আগুন রোদে একলা একলা তুমুল হাটি

এক সকালের চায়ের কাপে আমার অলস প্রহর ডুবিয়ে রাখি

এক দিনেতে তোমায় নিয়ে একশ হাজার কাব্য লিখি

এক মুহূর্তে রোদেলা দুপুর তোমার কথায় বৃষ্টি হয়ে আমায় ভেজায়

 

ঊনপ্রচ্ছদ

১.

-আচ্ছা, আমাদের ক্যাম্পাসে লেখালেখির জন্য ওই রকম কোন প্লাটফর্ম নেই, না?

-জাস্ট লেখালেখির জন্য নেই কিন্তু আমাদের অরণীতে এই চর্চাটা কিছুটা আছে …

-তা আছে, কিন্তু অরণীতো নিয়মিত না, আর অরণীকে সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে দাবী করতে পারিনা, আমাদের বড় প্রোগ্রামের সুভেনির আর অরণীতে গোজামিল লেগে যায়। অরণীকে জাস্ট একটা সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে …

-যদি করতে পারিস তো ভা্লো; অনেকেই তো লেখে, তাদের জন্য একটা প্লাটফর্ম হয়, আর শিকড় এর জন্য একটা অর্জন হবে…

-দেখি দীপের সাথে কথা বলে দেখি।

২.

-অরণী নিয়ে লাস্ট এক্সেকিউটিভ মীটিং এ একটা ডিসিশন আসছে, এখন থেকে অরণী দুই মাস পর পর প্রতিটি বাংলা ঋতুতে একটি করে বের হবে…

-বলিস কি, দুই মাস পর পর?

– আর তৌহিদ ভাই এর সাথে কথা হয়েছে,  সে একটা চমৎকার আইডিয়া দিয়েছে…

-কি আইডিয়া?

-ছয় ঋতুর ছয় অরণীর ছয়টি আলাদা আলাদা নাম…

-নাম ঠিক করেছিস?

-প্রায়।

-প্রায় মানে?

-মানে হলো পাঁচটি অরণীর নাম মোটামুটি ফাইনাল। গ্রীষ্ম সংখ্যার নাম রদ্রপ্রয়াগ, বর্ষারটা মেঘমল্লার, হেমন্তে ময়ূখ, শীতে হেমকুট আর বসন্ত সংখ্যার নাম পুষ্পরাগ।

-অদ্ভূত সুন্দর নাম, কে দিল?

-তৌহিদ ভাই আর পুষ্পরাগ নাম তা পলাস ভাই এর দেয়া।

-হুম, কিন’ শরৎ সংখ্যার নামটা বললি না?

-ওইটা নিয়ে একটু কনফিউসন আছে। ওটা দেরি আছে, আপকামিং তো পুষ্পরাগ, ওইটা বের করি, পরে দেখা যাবে।

৩.

-অরণীর লেখা এসেছে কয়েকটা, টাইপ করতে হবে।

-আমাকে কয়েকটা দে…

-আচ্ছা, করে ফেলিস…কয়েকটা শাবিব, হিমেল আর আসিফ করছে

-আর শোন…

-কি?

-দেখতো, লেখাটা কেমন হয়েছে?

-তোর?

-হুম।

-এটাও টাইপ করে ফেলিস…

-না, আমি এটা করব না, তোরা কেউ কর…

-কেন? সমস্যা কি? আচ্ছা দে…

৪.

-প্রচ্ছদের কি অবস্থা, রাসেল ভাই?

-প্রচ্ছদ তো আঁকছি, কিন্তু স্ক্যান করাব নাকি ছবি তুলে কম্পিউটারে নিয়ে নিবো বুঝতেছি না…

-তোমার মোবাইলের ক্যামেরা তো ভাল, ছবি তুলে দেখ… ভাল হলে তো হলোই…

-হুম

৫.

-ভাই, এত ঝামেলা জানলে তো প্রেসে দিতাম।

-আরে ব্যাটা, প্রেসে দিলে কি এই মজাটা পাইতি?

-হুম, অনেক মজা, এক পেইজ সেটআপ নিয়ে চার ঘন্টা ধরে বসে আছি।

-মজা শেষ হয় নাই তো… প্রিন্ট কপি বের করে তার হিসেব মিলিয়ে পেজ গুলো বসাতে হবে, তারপর প্রচছদেও সাথে স্ট্যাপলার মারতে হবে…

-অ্যাড গুলা কি করব?

-গ্রে স্কেল এ দিয়ে দে… পিকচার প্রপারটিজে গিয়ে।তাইলে কালার প্রিন্ট না করলেও সমস্যা হবে না।

-তথাস্তু

৬.

-আসিফ আর মহিদুল প্রিন্ট বের করবে, তুই গুছায় দিবি…আমি স্ট্যাপ্লার মারব…ওকে?

-হুম, ওদের ‘ভাই-ভাই প্রিন্টিং’ প্রেস আর আমাদের ‘বাপ-বেটা বাঁধাই ঘর’।

-কথা কম বলে হাত চালাও…পেজ গুলা যাতে বাকা না হয়।

-আচ্ছা দীপ…কয় কপি বাইর করবি আজকে?

-করতে থাক…টারগেট ৫০…না হইলেও যেন ৩০ হয়…কালকের জিএম এর জন্য ৫০ টা হলে ভাল…মীটিং এর সময় পোলাপান আগ্রহ করে নিবে…

-৫০টা সেল করতে পারলে যা খরচ করছি উঠে যাবে মনে হয়।

-আরে ব্যাটা না উঠলে নাই…জিনিসটা কেমন হইল ওটাই বিষয়…

-সেটাই…

৭.

-আহ…জিনিসটা হাতে নিয়া বইসা থাকতেও ভাল লাগতেছে…

-হোমমেইড হিসাবে জোশ হইসে…প্রচ্ছদটা সবচেয়ে সুন্দর…

-ক্যান! ভিতরের লেখাগুলা সুন্দর না?

-তা তো অবশ্যই…

-কয়েকটা কপি নিয়া আমি আর হিমেল জাফর স্যার , জহির স্যার আর রনি ম্যাম এর কাছে যাব

-উনাদের জন্য নিশ্চয়ই স্পেশাল রেট…

-আবার জিগায়…হা হা হা

-প্রেসিডেন্ট এর জন্যও তো একটা স্পেশাল রেট থাকা দরকার…কি বলো মহিদুল ভাই?

-হ…তোমাগো প্রিন্ট করতে যে হেল্প করছি…ওইটার দামটাও দিও…

-হা হা হা…

মাত্রা

ঈশিতার সঙ্গে আজ ঠিক কতদিন পর কথা হলো, দিশা মনে করতে পারলো না। একই ইউনিভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্টে পড়তো ওরা। তারচেয়ে বড় কথা খুব ভাল বন্ধু ছিল পরস্পরের। ছিল! সময়ের ব্যবধান অকৃত্রিম সম্পর্ককে করেছে অনেক বেশী formal। কিন্তু এমন হবে তা তো ওদের সপ্নেও হয়তোবা ছিল না। ভালোবাসা ওদের মাঝে তৈরী হওয়া দেয়ালের নোনাধরা পলেস্তারের মত খসে গেছে। ভাঙ্গনটা শুরু হয়েছিল ভার্সিটি লাইফের শেষের দিকে। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ,একদিনেই তো সব শেষ হয়ে যায় না। এতো আর শিশুদের আড়ি আড়ি খেলা নয়। দিশা ভাবে, কত সহজই না ছিল ওদের সম্পর্ক। তবুও পারলো না মানসিক সীমাবদ্ধতার গন্ডি পেরিয়ে এগিয়ে যেতে। ভার্সিটির অন্যতম এবং অন্যতমদের মধ্যে সেরা ছিল ঈশিতা। চমৎকার আবৃত্তি করতো, ভালো গানও গাইতো। পড়াশোনাও ছিল সেরা। পরে scholarship নিয়ে Ph.D করতে গিয়েছিল কানাডায়। সেই তুলনায় দিশার ক্যারিয়ার অনেক সাদামাটা। পাশ করে মোটামুটি ভালো বেতনের একটা চাকরী ও পেয়ে গেছে। বাবা-মার থেকে বিয়ের চাপ বাড়তে বাড়তে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে। আজ যখন ঈশিতা ফোন করে তখন অফিসের জন্য তৈরী হচ্ছিল দিশা। ঈশিতা যে দেশে এসেছে জানত না দিশা। ভালো থাকা না থাকা আর পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন ছিল ওদের আলাপের বিষয়। মজার ব্যপার হলো দিশা ঈশিতার পরিচয় পেয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় জিগ্যেস করেছিল, “কি খবর তোর, কেমন আছিস?” এখন ওব নিজের কাছেই খুব আশ্চর্য লাগছে।

ভার্সিটির হলে ওঠার দিন, রুমে ঢুকে জিনিসপত্র রেখে একটু গুছিয়ে বসে আবিস্কার করেছিল চশমাপরা পরীর মত এক সুন্দরী মেয়ে ওর দিকে নাক কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ও কি বলবে খুঁজে পাচ্ছিল না। মেয়েটাই এগিয়ে এলো কথা বলতে। ওর প্রথম কথা ছিল, “আমি ঈশিতা, তোর নাম কি?”খুব রাগ হয়েছিল দিশার। পরিচয় না, বন্ধুত্ব না সরাসরি ‘তুই’! সেই থেকে শুরু। এরপর কখনই ওরা অন্য কোনো সম্বোধন করেনি। ছোটখাট শেয়ারিং আর গ্রুপ স্টাডি করার মধ্য দিয়ে ওরা যে কখন এক অবিচ্ছেদ্দ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল তা টের পায়নি। বিশ্বাস, নির্ভরতা আর ছোট ছোট আবেগের বাধঁনে বাঁধা হয়ে গিয়েছিল দু’জনের জীবন। এতদিন পর ঈশিতার দেশে ফেরা, দিশাকে তলিয়ে দিচ্ছিল পুরোন সব দিনের স্মৃতির গহ্বরে।

থার্ড ইয়ারের শেষ দিকে রুমির সাথে পরিচয় হয়েছিল দিশার। প্রথম দেখা হয়েছিল ক্যাফেটরিয়ার বারান্দায়। দিশা বসেছিল ঈশিতা আর নোমানের সাথে। নোমানই পরিচয় করে দিয়েছিল ওর রুমমেট জামীর বড় ভাই, মার্স্টাসে পড়ুয়া রুমির সাথে। সেই থেকে শুরু। তারপর ক্যাফেটরিয়ার বারান্দার অসংখ্য বিকেল কিংবা ছাতিম তলায় বাদাম চিবিয়ে কাটানো অগুণতি সন্ধে কেমন করে যেন দু’জনকে নিয়ে যাচ্ছিল অন্যরকম এক সপ্নময় জগতে। কিন্তু কেমন করে যে ওদের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত সংখ্যার বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেল।

ঈশিতা কিংবা রুমি এদের কারও কারণে দিশার জীবন থেমে থাকে নি। হয়ত চলার পথে জীবন বয়ে চলার ভার বেড়েছিল তবে একেবারে থেমে থাকেনি কখনই। আর এখন তো বলা যায় জীবন সময়ের সাথেই ছুটছে। হয়ত ঈশিতার ফোন কিছু সময়ের জন্য ওকে পিছিয়ে নিয়েছিল অদূর অতীতের আঙ্গিনায়। অফিসে ঢুকে দিশা তার নিজের রুমে ঢুকতে যাচ্ছিল পিয়ন বলল,“ম্যাডাম, বড় স্যার আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।” ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দিশা বুঝতে পারল সকালেই বসের তলবের কারন। দিশা ক্লান্ত পায়ে এগুলো বসের রুমের দিকে। সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরেও দমবন্ধ লাগছিল ওর। বসের sound proof রুমের বাইরের দিককার দেয়ালে আছড়ে পড়ছিল সারা শহরের কোলাহল। মরচে পড়া অনুভবে টের পেল দিশা। জানালায় আধ-কমলা রোদের ছটায় চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল ওর।

২.

প্রতিটি মানুষ তার নিজেকে বিচার করে তার নিজস্ব চাওয়া-পাওয়ার মাপকাঠিতে। সে হিসেবে আবু সাদাত নিজেকে সফল বলে দাবি করতে পারে। বিখ্যাত এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার সে। জীবনের শুরুতে অভাব আর অনটনের মত এদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ বিষয়ের সাথে যুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধক হিসেবে অসাধারণ ছিল তার নিজের পরিবার। বাবার অনিচ্ছায় সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন নিজেকে। খুব ছোটবেলায় মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে যে পিটুনি খেয়েছিলেন পরবর্তীতে সেটা তার কাছে ধরা দেয় বাবার চরম অসন্তোষ আর ঘৃণা হয়ে। মাট্রিক পরীক্ষার পর থেকে আর কখনোই কথা হয়নি বাবার সাথে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবর আলী তার সমস্ত জীবন দিয়ে ঘৃণা করে গেছেন তার নিজের পুত্রকে।

আবু সাদাতের বয়স ছেচল্লিশ। বয়সের তুলনায় তার পোস্ট, বেতন কোম্পানির অনেকের ঈর্ষার কারণ। স্ত্রী আর দুই মেয়ের সংসার তার। মেয়ে দুটি ছোট। তার স্ত্রী সাদামাটা নির্ভেজাল মানুষ। হয়ত বা কিছুটা বোকাসোকাও। অন্তত আবু সাদাতের তা-ই মনে হয়। কারণ এতদিন পাশাপাশি থেকেও তার সুখে থাকার ভানটা ওর কাছে ধরা পড়ল না। নাকি সাবেরা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যায় তার স্বামীর একমাত্র ব্যর্থতা। নাকি যে অহং এর উপর দাড়িয়ে আছে সাদাতের সাম্রাজ্য, তার মর্মমূলে আঘাত দিয়ে হারাতে চায় না সুখ আর সমৃদ্ধি। হোক না সে সুখ আরোপিত, কিন্তু ভীষন স্বস্তিকর তো। জেদের বশে ঘর ছেড়ে এতদিনের সব অর্জন, বড় পলকা লাগে মাঝে মধ্যে। বাবার ঘৃণার আগুন এখনও ছুঁয়ে যায় আবু সাদাতকে। অফিসে ফার্স্ট আওয়ারে এসব কথাই ভাবছিল আবু সাদাত। পি.এ জানালো দিশা ম্যাডাম এসেছেন। আবু সাদাত দিশাকে ডেকে পাঠালেন। সাদাত কখনোই তার অধস্তনদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করেন না। সাদাতের রুমে ঢোকার সময় দিশাকে বড় ক্লান্ত লাগছিল। দিশাকে বসতে বলে আবু সাদাত হাতের কাজ সারছিলেন। হঠাৎ করেই খেয়াল করলেন মুগ্ধ চোখে দিশা তাকিয়ে আছে জানালায়। আবু সাদাত ভাবছিলেন, তার এত সুখ সর্মৃদ্ধি সত্তেও সামান্য ভালোলাগার সহজাত অনুভূতি প্রকাশে অকৃপণ হতে পারেন না। নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হচ্ছিল তার। দিশার উপস্থিতি ভুলে যাচ্ছিলেন তিনি। আভিজাত্যের বুননে তৈরী চার দেয়াল ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিল তার উপর বাবর আলীর সকল আক্রোশ নিয়ে।