ঈশিতার সঙ্গে আজ ঠিক কতদিন পর কথা হলো, দিশা মনে করতে পারলো না। একই ইউনিভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্টে পড়তো ওরা। তারচেয়ে বড় কথা খুব ভাল বন্ধু ছিল পরস্পরের। ছিল! সময়ের ব্যবধান অকৃত্রিম সম্পর্ককে করেছে অনেক বেশী formal। কিন্তু এমন হবে তা তো ওদের সপ্নেও হয়তোবা ছিল না। ভালোবাসা ওদের মাঝে তৈরী হওয়া দেয়ালের নোনাধরা পলেস্তারের মত খসে গেছে। ভাঙ্গনটা শুরু হয়েছিল ভার্সিটি লাইফের শেষের দিকে। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ,একদিনেই তো সব শেষ হয়ে যায় না। এতো আর শিশুদের আড়ি আড়ি খেলা নয়। দিশা ভাবে, কত সহজই না ছিল ওদের সম্পর্ক। তবুও পারলো না মানসিক সীমাবদ্ধতার গন্ডি পেরিয়ে এগিয়ে যেতে। ভার্সিটির অন্যতম এবং অন্যতমদের মধ্যে সেরা ছিল ঈশিতা। চমৎকার আবৃত্তি করতো, ভালো গানও গাইতো। পড়াশোনাও ছিল সেরা। পরে scholarship নিয়ে Ph.D করতে গিয়েছিল কানাডায়। সেই তুলনায় দিশার ক্যারিয়ার অনেক সাদামাটা। পাশ করে মোটামুটি ভালো বেতনের একটা চাকরী ও পেয়ে গেছে। বাবা-মার থেকে বিয়ের চাপ বাড়তে বাড়তে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে। আজ যখন ঈশিতা ফোন করে তখন অফিসের জন্য তৈরী হচ্ছিল দিশা। ঈশিতা যে দেশে এসেছে জানত না দিশা। ভালো থাকা না থাকা আর পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন ছিল ওদের আলাপের বিষয়। মজার ব্যপার হলো দিশা ঈশিতার পরিচয় পেয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় জিগ্যেস করেছিল, “কি খবর তোর, কেমন আছিস?” এখন ওব নিজের কাছেই খুব আশ্চর্য লাগছে।

ভার্সিটির হলে ওঠার দিন, রুমে ঢুকে জিনিসপত্র রেখে একটু গুছিয়ে বসে আবিস্কার করেছিল চশমাপরা পরীর মত এক সুন্দরী মেয়ে ওর দিকে নাক কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ও কি বলবে খুঁজে পাচ্ছিল না। মেয়েটাই এগিয়ে এলো কথা বলতে। ওর প্রথম কথা ছিল, “আমি ঈশিতা, তোর নাম কি?”খুব রাগ হয়েছিল দিশার। পরিচয় না, বন্ধুত্ব না সরাসরি ‘তুই’! সেই থেকে শুরু। এরপর কখনই ওরা অন্য কোনো সম্বোধন করেনি। ছোটখাট শেয়ারিং আর গ্রুপ স্টাডি করার মধ্য দিয়ে ওরা যে কখন এক অবিচ্ছেদ্দ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল তা টের পায়নি। বিশ্বাস, নির্ভরতা আর ছোট ছোট আবেগের বাধঁনে বাঁধা হয়ে গিয়েছিল দু’জনের জীবন। এতদিন পর ঈশিতার দেশে ফেরা, দিশাকে তলিয়ে দিচ্ছিল পুরোন সব দিনের স্মৃতির গহ্বরে।

থার্ড ইয়ারের শেষ দিকে রুমির সাথে পরিচয় হয়েছিল দিশার। প্রথম দেখা হয়েছিল ক্যাফেটরিয়ার বারান্দায়। দিশা বসেছিল ঈশিতা আর নোমানের সাথে। নোমানই পরিচয় করে দিয়েছিল ওর রুমমেট জামীর বড় ভাই, মার্স্টাসে পড়ুয়া রুমির সাথে। সেই থেকে শুরু। তারপর ক্যাফেটরিয়ার বারান্দার অসংখ্য বিকেল কিংবা ছাতিম তলায় বাদাম চিবিয়ে কাটানো অগুণতি সন্ধে কেমন করে যেন দু’জনকে নিয়ে যাচ্ছিল অন্যরকম এক সপ্নময় জগতে। কিন্তু কেমন করে যে ওদের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত সংখ্যার বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেল।

ঈশিতা কিংবা রুমি এদের কারও কারণে দিশার জীবন থেমে থাকে নি। হয়ত চলার পথে জীবন বয়ে চলার ভার বেড়েছিল তবে একেবারে থেমে থাকেনি কখনই। আর এখন তো বলা যায় জীবন সময়ের সাথেই ছুটছে। হয়ত ঈশিতার ফোন কিছু সময়ের জন্য ওকে পিছিয়ে নিয়েছিল অদূর অতীতের আঙ্গিনায়। অফিসে ঢুকে দিশা তার নিজের রুমে ঢুকতে যাচ্ছিল পিয়ন বলল,“ম্যাডাম, বড় স্যার আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।” ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দিশা বুঝতে পারল সকালেই বসের তলবের কারন। দিশা ক্লান্ত পায়ে এগুলো বসের রুমের দিকে। সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরেও দমবন্ধ লাগছিল ওর। বসের sound proof রুমের বাইরের দিককার দেয়ালে আছড়ে পড়ছিল সারা শহরের কোলাহল। মরচে পড়া অনুভবে টের পেল দিশা। জানালায় আধ-কমলা রোদের ছটায় চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল ওর।

২.

প্রতিটি মানুষ তার নিজেকে বিচার করে তার নিজস্ব চাওয়া-পাওয়ার মাপকাঠিতে। সে হিসেবে আবু সাদাত নিজেকে সফল বলে দাবি করতে পারে। বিখ্যাত এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার সে। জীবনের শুরুতে অভাব আর অনটনের মত এদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ বিষয়ের সাথে যুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধক হিসেবে অসাধারণ ছিল তার নিজের পরিবার। বাবার অনিচ্ছায় সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন নিজেকে। খুব ছোটবেলায় মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে যে পিটুনি খেয়েছিলেন পরবর্তীতে সেটা তার কাছে ধরা দেয় বাবার চরম অসন্তোষ আর ঘৃণা হয়ে। মাট্রিক পরীক্ষার পর থেকে আর কখনোই কথা হয়নি বাবার সাথে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবর আলী তার সমস্ত জীবন দিয়ে ঘৃণা করে গেছেন তার নিজের পুত্রকে।

আবু সাদাতের বয়স ছেচল্লিশ। বয়সের তুলনায় তার পোস্ট, বেতন কোম্পানির অনেকের ঈর্ষার কারণ। স্ত্রী আর দুই মেয়ের সংসার তার। মেয়ে দুটি ছোট। তার স্ত্রী সাদামাটা নির্ভেজাল মানুষ। হয়ত বা কিছুটা বোকাসোকাও। অন্তত আবু সাদাতের তা-ই মনে হয়। কারণ এতদিন পাশাপাশি থেকেও তার সুখে থাকার ভানটা ওর কাছে ধরা পড়ল না। নাকি সাবেরা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যায় তার স্বামীর একমাত্র ব্যর্থতা। নাকি যে অহং এর উপর দাড়িয়ে আছে সাদাতের সাম্রাজ্য, তার মর্মমূলে আঘাত দিয়ে হারাতে চায় না সুখ আর সমৃদ্ধি। হোক না সে সুখ আরোপিত, কিন্তু ভীষন স্বস্তিকর তো। জেদের বশে ঘর ছেড়ে এতদিনের সব অর্জন, বড় পলকা লাগে মাঝে মধ্যে। বাবার ঘৃণার আগুন এখনও ছুঁয়ে যায় আবু সাদাতকে। অফিসে ফার্স্ট আওয়ারে এসব কথাই ভাবছিল আবু সাদাত। পি.এ জানালো দিশা ম্যাডাম এসেছেন। আবু সাদাত দিশাকে ডেকে পাঠালেন। সাদাত কখনোই তার অধস্তনদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করেন না। সাদাতের রুমে ঢোকার সময় দিশাকে বড় ক্লান্ত লাগছিল। দিশাকে বসতে বলে আবু সাদাত হাতের কাজ সারছিলেন। হঠাৎ করেই খেয়াল করলেন মুগ্ধ চোখে দিশা তাকিয়ে আছে জানালায়। আবু সাদাত ভাবছিলেন, তার এত সুখ সর্মৃদ্ধি সত্তেও সামান্য ভালোলাগার সহজাত অনুভূতি প্রকাশে অকৃপণ হতে পারেন না। নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হচ্ছিল তার। দিশার উপস্থিতি ভুলে যাচ্ছিলেন তিনি। আভিজাত্যের বুননে তৈরী চার দেয়াল ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিল তার উপর বাবর আলীর সকল আক্রোশ নিয়ে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s